ইসলামি ক্যালেন্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো মহররম মাসের ১০ তারিখ, যা আশুরা নামে পরিচিত। এ দিনকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে নানা ঘটনা ও কাহিনি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসবের অনেকগুলোই নির্ভরযোগ্য হাদিস বা প্রামাণ্য সূত্রে প্রমাণিত নয়। ইসলামি গবেষক ও মুহাদ্দিসদের মতে, এসব মনগড়া বর্ণনা ইসলামের নামে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
১. আশুরার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে
অনেকের ধারণা, মহররমের ১০ তারিখেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। কিন্তু হাদিস বিশারদদের মতে, এ বিষয়ে কোনো সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। আল্লামা আব্দুল হাই লাখনভী (রহ.)-সহ একাধিক গবেষক এ বক্তব্যকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
২. পৃথিবীতে প্রথম বৃষ্টিপাত হয়েছিল আশুরার দিনে
সমাজে প্রচলিত আরেকটি বিশ্বাস হলো, পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো বৃষ্টি নেমেছিল আশুরার দিন। তবে ইতিহাস ও ধর্মীয় গ্রন্থ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। বরং এটি জাল বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত।
৩. হজরত ইব্রাহিম (আ.) এই দিনে আগুন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন
নমরুদের প্রজ্বলিত আগুন থেকে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অলৌকিকভাবে রক্ষা পাওয়ার ঘটনা ইসলামে সুপরিচিত। তবে এই ঘটনা আশুরার দিন ঘটেছিল—এমন কোনো সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। তাই এ দাবিকে নির্ভরযোগ্য বলা যায় না।
৪. হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন আশুরার দিনে
অনেক ওয়াজ বা বয়ানে বলা হয়, হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে আশুরার দিন মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু সহিহ হাদিসের আলোকে এ দাবির সত্যতা পাওয়া যায় না। ইসলামি গবেষকরা এটিকেও ভিত্তিহীন বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৫. বিভিন্ন নবীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আশুরার দিনেই ঘটেছে
কিছু প্রচলিত বয়ানে বলা হয়, হজরত দাউদ (আ.), সুলাইমান (আ.), ইউসুফ (আ.) কিংবা ঈসা (আ.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আশুরার দিন সংঘটিত হয়েছিল। তবে ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) ও ইমাম সুয়ুতী (রহ.)-এর মতো বিশিষ্ট আলেমরা এসব বর্ণনাকে ‘মওজু’ বা জাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য কী?
সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, এই দিনে মহান আল্লাহ হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সাগরে নিমজ্জিত করেন। এ ঘটনার শুকরিয়া হিসেবে হজরত মুসা (আ.) রোজা পালন করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও আশুরার রোজা রাখার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়ানোর জন্য তিনি ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সতর্কতা
ইসলামের নামে ভিত্তিহীন বা জাল বর্ণনা প্রচার করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তাই আশুরা কিংবা অন্য যেকোনো ধর্মীয় বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের ওপর নির্ভর করাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব।
(তথ্যসূত্র: সহিহ হাদিস, ইসলামি গবেষকদের ব্যাখ্যা এবং হাদিস বিশারদদের মতামত)